কিডনি রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন

কিডনি বিকল হওয়ার উপসর্গ সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কিডনির কর্মক্ষমতা নষ্ট হওয়ার আগে বোঝা যায় না। কিছু লক্ষণ কিডনি রোগের সংকেত বহন করে। জেনে নিন কিডনি রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত

কিডনি রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন
কিডনি রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন

পৃথিবীতে মানবজাতি যেসব প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে তার মধ্যে কিডনি রোগ অন্যতম। তাই আমাদের জানা দরকার কিডনি রোগের প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে করণীয়।

মানবদেহের অতিপ্রয়োজনীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে কিডনি অন্যতম। মানবদেহের কোমরের কিছুটা ওপরে দুই পাশে দুটি কিডনি থাকে। পরিণত বয়সে একটি কিডনি ১১-১৩ সেমি লম্বা, ৫-৬ সেমি চওড়া এবং ৩ সেমি পুরু হয়। একটি কিডনির ওজন প্রায় ১৫০ গ্রাম। তবে বাম কিডনিটি ডান কিডনি অপেক্ষা একটু বড় ও কিছুটা ওপরে থাকে। প্রতিটি কিডনি প্রায় ১২ লাখ নেফ্রন দিয়ে তৈরি। নেফ্রন হলো কিডনির কার্যকর ও গাঠনিক একক। কোনো কারণে এই নেফ্রনগুলো নষ্ট হয়ে গেলে কিডনি দ্রুত অকেজো হয়ে যায়।

কিডনি রোগে সাধারণত একসঙ্গে দুটি কিডনি আক্রান্ত হয়। আমাদের দেহে প্রতিনিয়ত অসংখ্য জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হচ্ছে। এসব বিক্রিয়ায় উত্পন্ন দূষিত পদার্থ রক্তে মিশে যায়। আর কিডনি তার ছাঁকনির মাধ্যমে রক্তকে ছেঁকে পরিশোধিত করে এবং দূষিত পদার্থগুলো (ইউরিয়া, ইউরিক এসিড, অ্যামোনিয়া, ক্রিয়েটনিন ইত্যাদি) দেহ থেকে মূত্রের সঙ্গে বের করে দেয়। এভাবে কিডনি আমাদের দেহকে বিষাক্ত ও ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থের হাত থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়াও কিডনির অন্যান্য কাজ আছে।

কিডনি রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন

কিডনি রোগ এমনই মারাত্মক যা কোনো প্রকার লক্ষণ বা উপসর্গ ছাড়া খুব ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। তাই একে নীরব ঘাতক বলে অভিহিত করা হয়। কখনো কখনো রোগী কোনো উপসর্গ বুঝে ওঠার আগেই তার কিডনির শতকরা ৫০ ভাগ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিডনি রোগ যেহেতু অনেক প্রকার সেহেতু এর লক্ষণও ভিন্ন ভিন্ন।

কিডনি রোগের প্রধান প্রধান লক্ষণ হচ্ছে হঠাৎ করে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, প্রস্রাবে পরিমাণ ও সংখ্যার পরিবর্তন বিশেষ করে রাতে বেশি প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হওয়া, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত এবং প্রোটিন যাওয়া, চোখের চারপাশে ও পায়ের গোড়ালিতে পানি জমা, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া করা ও অস্বাভাবিক গন্ধ হওয়া, রক্তশূন্যতা বেড়ে যাওয়া, মাথাব্যথা ও শরীর চুলকানো, বমি বমি ভাব, প্রস্রাবের সঙ্গে পাথর বের হওয়া, হাত, পা মুখসহ সমস্ত শরীর ফুলে যাওয়া, গ্লোমেরুলার ফিল্টারেশন রেট ৯০-এর কম হওয়া।

যেসব খাবারে কিডনি ভালো থাকে :

কিডনি রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন

প্রতিদিন অন্তত ৮ গ্লাস (২ লিটার) বিশুদ্ধ পানি পান করা। তবে ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের ক্ষেত্রে অধিক পানি পান করা প্রয়োজন।

প্রচুর ফল ও সবজি :

দানা বা বীজ জাতীয় খাদ্য খান যেমন ব্রেড, নুডুলস, বাদাম ইত্যাদি। সপ্তাহে অন্তত একটি কচি ডাবের পানি পান করুন। প্রতিদিন অন্তত চারটি থানকুচি পাতা খেতে হবে। শশা, তরমুজ, লাউ, বাঙ্গি, কমলালেবু, লেবু, মাল্টা, ডালিম, বীট, গাজর, আখের রস, বার্লি, পিয়াজ, সাজনা ইত্যাদি পরিমাণ মতো খেতে হবে।

কিডনি রোগীর অবশ্য বর্জনীয় খাদ্যসমূহ :

চকোলেট, চকোলেট দুধ, পনির, গরুর মাংস, খাসির মাংস, মুরগীর মাংস, সস, পিচস, ব্রকোলি, বাদাম, মাশরুম, মিষ্টি কুমড়া, পালংশাক, টমেটো, কলা, খেজুর ও আচার।

গোক্ষুর :

গবেষণায় দেখা গেছে যাদের প্রসাবের পরিমাণ কমে যায় এবং হাত পায়ে পানি জমে তারা নিয়মিত গোক্ষুর চূর্ণ ৩ গ্রাম মাত্রায় সেবন মূত্রের পরিমাণ ঠিক হয়ে যাবে এবং শরীরে জমে থাকা পানি বা ইউরিক এসিডের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।

রক্ত চন্দন:

রক্ত চন্দন কিডনি রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ। রক্ত চন্দন ডাই ডাইরুটিক হিসাবে কাজ করে। এছাড়া প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বন্ধ করে এবং প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

জুনিপার বেরিস:

জুনিপার বেরি মূত্রবর্ধক হিসাবে কাজ করে, কিডনির কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে।

পাথরকুচি:

গবেষণায় দেখা গেছে পাথরকুচি পাতার নির্যাস কিডনি পাথরী ধ্বংস করতে খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

কিডনির নানান ধর নের রোগের লক্ষণ আলাদা আলাদা হয় , যার মধ্যে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি প্রধানত দেখা যায়:

  • সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে চোখ ফুলে যাওয়া।
  • মখ এবং পা ফুলে যাওয়া।
  • ক্ষুধামান্দ্য , বমি ভাব , দুর্বল ভাব।
  • বার বার প্রস্রাবের বেগ , বিশেষ করে রাত্রে।
  • কম বয়সে উচ্চ রক্তচাপ
  • শারীরিক দুর্বল ভাব , রক্ত ফ্যাকাসে হওয়া।
  • অল্প হাঁটার পরে, নি শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা তাড়াতাড়ি ক্লাস্তি অনুভব করা।
  • ৬ বছর বয়সের পরেও রাত্রে বিছানায় প্রস্রাব করা।
  • প্রস্রাব কম আসা ।
  • প্রস্রাব করার সময় জুলন অনুভব করা এবং প্রস্রাবে রক্ত বা পুজ-এর উপস্থিতি।
  • প্রস্রাব করার সময় কষ্ট হওয়া। ফোটা ফোটা করে প্রস্রাব হওয়া।
  • পেটের মধ্যে গিট হওয়া , পা আর কোমরের যন্ত্রণা।

উপরোক্ত লক্ষণগুলির মধ্যে কোনও একটি লক্ষণের উপস্থিতি থাকলে কিডনির রোগের সম্ভাবনা থাকতে পারে , এবং তৎক্ষণাৎ ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে চেক-আপ করানো দরকার।

কিডনির রোগের নির্ণয়

কিডনির অনেক রোগ-চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। জটিল কিন্তু সম্পূর্ণ নিরাময় হয় না। দুর্ভাগ্যবশত অনেক গভীর কিডনির রোগের লক্ষণ শুরুতে কম দেখা যায়। এইজন্য যখনই কিডনির রোগের আশঙ্কা হয়, তখনই বিনা বিলম্বে ডাক্তারবাবর সঙ্গে পরামর্শ করে নির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু করা দরকার।

কিডনির পরীক্ষা কাদের করানোর দরকার? কিডনির রোগের সম্ভাবনা অধিক কখন ?

১. যে ব্যক্তির কিডনির রোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
২. ডায়াবিটস (মধুমেহ) রোগগ্রস্ত ব্যক্তি।
৩. উচ্চ-রক্তচাপযুক্ত ব্যক্তি (High Blood Pressure)
৪. পরিবারে বংশানুগতিক কিডনি রোগের ইতিহাস।
৫. অনেক দিন ধরে যন্ত্রণা নিবারক (Pain Killer Tablets) ঔষধের সেবন।
৬. রেচনতন্ত্রে জন্মগত রোগ
৭. ২-৫ বৎসর অন্তর নিয়মিত পরীক্ষা সাধারণের জন্য দরকার।
কিডনির রোগের নির্ণয়ের জন্য আবশ্যক পরীক্ষাগুলি হল

প্রস্রাবের পরীক্ষা

কিডনি রোগের নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রস্রাব পরীক্ষা অতি প্রয়োজনীয়—

• প্রস্রাবের পুজের (Pus) উপস্থিতি মূত্রনালিতে সংক্রমণের নিদর্শন।

• প্রস্রাবের প্রোটিন বা রক্তকণিকার উপস্থিতি গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস এর নিদর্শন।

মাইক্রোঅ্যালবুমিনেবিয়া

প্রস্রাবের এই পরীক্ষাটি ডায়াবিটিসের কারণে কিডনি খারাপ হবার সম্ভাবনা থেকে সর্বপ্রথম এবং সবথেকে তাড়াতাড়ি নির্ণয়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

প্রস্রাবের অন্য পরীক্ষাগুলি হল

(১) প্রস্রাবের টি.বি.র জীবাণুর (Bacteria) পরীক্ষা টি.বি. নির্ণয়ের জন্য।

(২) ২৪ ঘণ্টার মূত্রে প্রোটিনের মাত্রা (কিডনির ফোলাভাব আর তার চিকিৎসার প্রভাব জানার জন্য)

(৩) প্রস্রাব কালচার আর সেনসিটিভিটি পরীক্ষা (প্রস্রাব সংক্রমণের জন্য দায়ী ব্যাকটিরিয়া বিষয়ে জানতে আর তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যাপারে জানতে)

প্রস্রাবের পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির বিভিন্ন রোগের ব্যাপার জানা যায় কিন্তু প্রস্রাব পরীক্ষার রিপোর্ট স্বাভাবিক (Normal) হওয়া সত্ত্বেও কডনিতে কোনও রোগ নেই সেটা বলা যায় না।

রক্তের পরীক্ষা নিরীক্ষা

রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা

রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি (রক্তাল্পতা অ্যানিমিয়া) কিডনি ফেল হবার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। রক্তাল্পতা শরীরের অন্য কোনও রোগের নিদর্শনও হতে পারে সেজন্য এই পরীক্ষা সর্বদা কিডনির রোগের জন্যই করা হয় এমন নয়।

রক্তে ক্রিয়েটিনিন এবং ইউরিয়ার মাত্রা

এই পরীক্ষা কিডনির কার্যদক্ষতার পরীক্ষা। ক্রিয়েটিনিন আর ইউরিয়া হল শরীরের অনাবশ্যক বর্জ্য পদার্থ, কিডনির দ্বারা শরীরের বাইরে নিষ্কাশিত হয়। শরীরের ক্রিয়েটিনিন এর ধারাণ মাত্রা ০.৬ থেকে ১.৪ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার আর ইউরিয়ার সাধারণ ত্ৰা ২০ থেকে ৪০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার। কিডনিযুগল বিকল হলে দুটিরই ত্ৰা বাড়ে। এই পরীক্ষাটিও কিডনি রোগের নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রক্তের অন্যান্য পরীক্ষা

কিডনির বিভিন্ন রোগের নির্ণয়ের জন্য রক্তের অন্যান্য পরীক্ষাগুলি হল কোলেস্টোল, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্লোরাইড, ক্যালসিয়াম, ফসফেটস, কমপ্লিমেন্টস ইত্যাদি।

রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা

কিডনির সোনোগ্রাফি

এটি একটি সরল, সুরক্ষিত, শীঘ্র পদ্ধতি যার দ্বারা কিডনির র, অবস্থান, মূত্রমাগের অবরোধ, পাথর (Stone) ইত্যাদি ব্যাপারে জানা যায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ক্রনিক কিডনি ফেলিওর-হলে রোগীর কিডনির সংকোচন এই পরীক্ষার দ্বারা বোঝা যায়। কিডনির Size ছোট হয়ে যায়।)

পেটের এক্স-রে

এই পরীক্ষা মুখ্যত কিডনির স্টোন নির্ণয়ের জন্য করা হয়।

ইন্ট্রাভেনাস পাইলোগ্রাফি (আইভিপি)

এই পরীক্ষাতে রোগীকে এক বিশেষ ধরনের আয়োডিনযুক্ত (রেডিও কনট্রাস্ট পদার্থ) ঔষধের ইনজেকশন দেওয়া হয়। ইনজেকশন দেবার পরে অল্প অল্প সময়ের অন্তরালে পেটের (X-Ray) নেওয়া হয়।

এই (X-Ray) তে ঔষধ কিডনির মধ্য দিয়ে মূত্রনালিকা দ্বারা মূত্রাশয়ে জমা হতে দেখা যায়।

আইভিপির দ্বারা কিডনির কার্যক্ষমতা আর মূত্রনালিকার অবস্থানে ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায়। এই পরীক্ষা বিশেষ করে স্টোন, মূত্রনালিতে অবরোধ (obstacle) গীট-এর নির্ণয় করা যায়। যখন কিডনি খারাপ হবার পরে কম কাজ করে তখন এই পরীক্ষা কার্যকরী হয় না। রেডিও কনট্রাস্ট ইনজেকশন খারাপ কিডনিকে আরও খারাপ করতে পারে। এই কারণে কিডনি বিকল রোগীদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা ক্ষতিকারক হতে পারে। আই.ভি.পি একটি X-Ray পরীক্ষা হবার কারণ, গর্ভাবস্থায় থাকা বাচ্চার জন্য হানিকারক হতে পারে। সেজন্য গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা করা হয় না

অন্য রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা

কিছু বিশেষ প্রকার কিডনির রোগের জন্য ডপলার, মিক্সইউরেটিং সিস্টোইরেথ্রোগ্রাম রেডিও নিউক্লিয়ার স্টাডি, রেনাল অ্যানজিওগ্রাফি, সি. টি. স্ক্যান, অ্যানটিগ্রেড আর রেট্রোগ্রেড পাইলোগ্রাফি ইত্যাদি পরীক্ষার দ্বারা নির্ণয় করা হয়।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা

কিডনি বায়োপসি , দূরবিন দ্বারা মূত্রনালিকার পরীক্ষা , এবং ইউরোডাইনামিক্সের মতো বিশেষ প্রকারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চডনির অনেক প্রকার রোগের নির্ণয়ের জন্য বিশেষ প্রয়োজন।